• (+91) 7890349404

বেদিয়াঃ বিহারের একটি সম্প্রদায় যারা হাজারিবাগ জেলার মোহদিপাহাড়ের আশে পাশে বসবাস করত এবং তারা বিশ্বাস করে যে, তারা বেদবংশি রাজপুত্র ও একটি মুন্ডা মেয়ের বংশধর থেকে এসেছে। অপর এক মত হল যে কুড়মী সম্প্রদায় একটি অংশ জাতিচ্যুত হয়ে কালক্রমে বেদিয়া অথবা ভ্রাম্যমান কুড়মী হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভোজন খেসারত দিয়ে পুনরায কুড়মীতে ফিরে যায়। অবশিষ্ট গরীবরা এই খেসারত দিতে না পারায় সময়ের ব্যাবধানে একটি পৃথক সম্প্রদায় বলে পরিগনিত হয়। রিজলের (১৮৮৫-১৮৯১ সরকারি দায়িত্ব প্রাপ্ত ইন্ডিয়ান সিভিল সারভিস অফিসার) মতে বেদিয়ারা ছোটনাগপুর অঞ্চলের কৃষির সঙ্গে যুক্ত একটি ছোট উপজাতি গোষ্টি। যাদের কুড়মীদের মাসতাত ভাই বলে মনে করা হয়। তিনি আরও বলেন সাঁওতালদের দ্বাদশতম অংশকে বেদিয়া বলা হয়। এরা ছোটনাগপুর অঞ্চলে হাজারিবাগ ও রাচি জেলায় বসবাস করত। পূর্বে এদের বাসস্থানের এলাকা হাল্কা জঙ্গলে আবৃত ছিল। এদের মোট জনসংখ্যা ৬০,৪৪৬ জন। এই জনগোষ্টির ৯৫.৭৯% গ্রাম্য এলাকায় থাকে। পঞ্চপরগনা এমন একটি জায়গা যেখানে এই জাতি নিজ গোষ্টির মধ্যে ইন্দো-আর্য ভাষা ব্যবহার করে এবং এদের লিপি দেবনাগরি হরপ। এরা নিরামিষাশী। এদের খাদ্যশস্য ভাত, ভুট্টা, মান্ডুয়া, গোন্ডালি ও গম এবং ডাল হিসাবে ব্যবহার করে উরাদ, ঘাংড়া, কুর্থী ও অড়হর। এরা রান্নার জন্য ব্যবহার করে সরগুজা, কেওঙ্গি (মহুযা বীজ) ও সরষার তেল। এরা পান করে মহুয়ার বীজ থেকে তৈরি মদ ও চালের বিয়ার (হাড়িয়া)। ছেলে মেয়েরা তামাক নেয় ও হুকা দিয়ে ধুমপান করে।



রিজলের মতে বেদিয়ারা বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। যাই হোক বর্তমান সমীক্ষা শনাক্ত করেছে কিছু উপজাতি অসবর্ণ বিবাহ সংক্রান্ত গোত্র যথা – পেচা, কাছুয়া, চিঢরা, মহুয়া, সুইয়া, বাম্বি ইত্যাদি। এরা মাহাতো পদবি ব্যবহার নিয়ে। বহুবিবাহের অনুমতি আছে কিন্তু একটি বিবাহ বেশি প্রচলিত। বিবাহ প্রতিক হিসাবে বিবাহিত নারী সিদুর দেয় ও লোহার বালা পরে। এদের পনপ্রথা বাধ্যতামুলক (কন্যা পক্ষ পন পেয়ে থাকে)। এরা প্যাট্রিলোকাল (স্ত্রী স্বামীর পরিবারে সকলের সঙ্গে বসবাস করে) বসবাসের নিয়ম অনুসারন করে। স্বামী বা স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারে ব্যাভিচার, সন্তানহীনতা, অবনিবনা, নিষ্ঠুরতা ও অলসতার ভিত্তিতে। বিধবাদের পুনঃবিবাহ ও বিবাহ-বিচ্ছেদ করতে পারে ব্যাভিচার, সন্তানহীনতা, অবনিবনা, নিষ্ঠুরতা ও অলসতার ভিত্তিতে। বিধবাদের পুনঃবিবাহ ও বিবাদ-বিচ্ছেদ অনুমতি যোগ্য ও একটি বিধবা মৃত স্বামীর ভাইকে বিবাহ করতে পারে। বেদিয়ারা একক ও যৌথ উভয় পরিবারে বসবাস করে। বাবার সম্পত্তি সব ছেলেরা সমান ভাগে পায় ও বড় ছেলে বাবার কতৃত্ব নিয়ে থাকে। মহিলারা পুরুষদের সঙ্গে পরিবারের সঙ্গে পরিবারের আয় ব্যায়ে অংশগ্রহণ করে। প্রথম অন্নপ্রাশন বাধ্যমূলক নয়। বিবাহের নিয়ম কনের জন্ম যেখানে হয়েছে সেই বাড়িতে বিয়ে শুরু হয় এবং শেষ হয় বরের বাড়িতে। মৃতদের কবর দেওয়া হয়। মৃত্যুর রীতিনীতি যেমন তেলনাহন ও দশকর্মা পালিত হয়।

জমিজমা থাকায় বেদিয়াদের প্রাথমিক পেশা কৃষি। তারা জ্বালানি বেচে, গালা ও অন্যান্য বনের দ্রব্য সংগ্রহ করে এবং শ্রমিক ও রিকসা চালক হিসাবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ১৯৮১ সালে জনগননা অনুসারে সম্পুর্ন জনসংখ্যার ৩৬.৪৩% শ্রমিক, যাদের ৮৫.৫৭% নিযুক্ত অর্থনীতির প্রাথমিক স্তরে (৬১.৩৯% কৃষিক ও ২৪.১৮% শ্রমিক), ৬.৮৫% খনির কাজে যুক্ত এবং ৭.৫৭% অন্যান্য কাজে। মাঝে মাঝে এরা শিকারে বের হয়। এদের ঐতিহ্যবাহি পরিষদ আছে যেখানে বংশপরম্পরায় আশিন কর্মচারি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিবাদের নিষ্পত্তি করে।



বেদিয়ারা ঐতিহ্যবাহি উপজাতি ধর্মের অনুসরনকারি। এদের পরিবার ও বংশের দেবতাগুলি হল মাই, মুদকাঠি, কুন্ড্রি, বানসা, দারহা ইত্যাদি। গ্রামের দেবতা য়ারা দ্বারা পুজিত হয় সেগুলি হল ঝেরবুড়ি, গাঁওয়াদেবতা, মহাদানিয়া, দূর্গা ও চন্ডি এবং আঞ্চলিক দেবতা হল পালচারু ও দেবপাহাড়ি। রাজারাপ্পা, হুন্ডু ও জোহনা জলপ্রপাত এবং জগন্নাথ পুরে এরা বার্ষিক মেলায় যায়। এদের পবিত্র বুদ্ধিদাতা হল পাহান, ভগৎ এবং ওঝা যারা অন্য সম্প্রদায় ভূক্ত হতে পারে। বেদিয়ারা ফাগুন, সারহুল, কার্মা, জিতিয়া এবং সহরাই উৎসব পালন করে। ১৯৮১ সালের জনগননা দেখায় ৯৬.৮৭% বেদিয়া হিন্দুধর্মালম্বী, ২.৯৩% মুসলমান, ০.০৮% খ্রীষ্টান ও ০.০২% অন্য ধর্মের অন্তর্গত। ১৯৭১ সালের জনগননা দেখায় ৯৯.৭৩% হিন্দু, ০.০৮% খ্রীষ্টান এবং অন্যান্যরা অন্য ধর্মভূক্ত। এটা দেখায় যে হিন্দুরা হ্রাসের দিকে বেদিয়ারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে। এদের ঐতিহ্য সংক্রান্ত লোককথা ও নাচ আছে এবং তারা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজায়। পুরুষ ও মহিলারা একসাথে নাচে অংশগ্রহণ করে। স্থানিয কারিগর, চাকুরীজীবি, কৃষক যেমন – নউয়া (নাপিত), লোহরা প্রভৃতি সম্প্রদায়ের সঙ্গে এদের ঐতিহ্যগত সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক আছে। বেদিয়াদের সঙ্গে মুন্ডা, ওঁরাও, বারিক এবং গব্ধু বা ভাগতদের স্বাদৃশ্য আছে।



এই জাতির মধ্যে ভূমিহীনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে যারা দিন মজুর হিসাবে কাজ করে। দারিদ্রতা এবং বাড়ি থেকে ইস্কুলের অবস্থান দুরে হওয়ায় এদের স্বাক্ষরতার হার নিচু। ১৯৮১ সমীক্ষা অনুসারে এদের গড় স্বাক্ষরতার হার ১০.৯০% মহিলাদের এই হার আরও নিচে ২.১০% পুরুষদের হার ১৯.৬৩%। দেশীয় ঔষধের কাজ না হলে এরা হাসপাতাল মুখি হয়। পরিবার পরিকল্পনায় এদের তেমন আগ্রহ নেই। এরা ঝর্না ও কুপ থেকে পানিয় জল সংগ্রহ করে। বেদিয়ারা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ করে রেল ও সড়ক পথের মাধ্যমে। বেসরকারি সুযোগসুবিধা এরা বেশি করে গ্রহন করে। এরা ব্যাঙ্ক লেন দেন গ্রহন করে না। পরিবর্তে আর্থিক সংকটে বেশি মাত্রায় মহাজনদের সরনাপন্ন হয়।



বেদিয়া যারা পশ্চিমবঙ্গে স্থায়িভাবে বসবাস আরম্ভ করল তারা বেদিয়া কুড়র্মী, ছোট কুড়র্মী ও সান কুড়র্মী নামে পরিচিত হল। তারা পুরুলিয়া, ঝালদা, মালিকপাড়া, ঝাড়গ্রাম ও রাজ্যের অন্যান্য স্থানে বসবাস স্থাপন করল। ১৯৮১ সালের জনগননা অনুসারে এদের জনসংখ্যা ২৯,৩৯৬। কুড়মালী যা একটি ইন্দ-আর্য ভাষা, এই ভাষায় এরা কথা বলে। এরা বাংলা এবং দেবনাগরী হরপ লিখার ক্ষেত্রে ব্যবহার করে। এরা গরুর মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকে। এরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে বিহারের বেদিয়াদের অনুসরন করেছিল। যদিও রিজলে (১৮৯১) বলেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বেদিয়ারা কাবলিওয়ালা, দরবাজিকর, জাদুকর, শিকারি, পক্ষিশিকারি, সাপুরে, ফেরিওয়ালা, মাছধরার বড়র্শী প্রস্তুতকারক, দস্তাশ্রমিক, কৃষক প্রভৃতি পোশাকে বেছে নিয়েছে। এদের কয়েকটি বিভাগ আছে যথা-বাবাজিয়া, লর/পাটোয়া, বাজিগর, কবুতরি, ভানুমতি, দোরবাজ (কাঞ্জরের হিন্দুদের সঙ্গে এদের জন্মগত ও জাতিগত মিল আছে), মাল (পানকুয়া), মিরশীকার (চিরিমারা), সামপেরিয়া, সন্দরম, রেজিয়া বেদিয়া। ১৯৮১ জনগননা অনুযায়ি এই জাতিগোষ্ঠির মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩২.৯০ জন শ্রমিক। এদের ৩৭.৫৬% কৃষি কাজে ফিরে এসেছে এবং ৫১.৩৬% কৃষি শ্রমিক ও অবশিষ্ট ১১.০৪% অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত।



পশ্চিমবঙ্গের বেদিয়ারা হিন্দুধর্মাবলম্বী। ১৯৮১ সালের জনগননা অনুযায়ি ৯৯.৩৫% হিন্দুধর্মালম্বী। ০.৩৭% মুসলীম। ০.১৭% খ্রীষ্টান এবং বাকিরা শিখ, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। ১৯৬১ ও ১৯৭১ জনগননা অনুযায়ী ১০০ ভাগ বেদিয়ায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিল। পশ্চিমবঙ্গের বেদিয়াদের শিক্ষাগত উন্নতি সামান্য বেশি। এদেও স্বাক্ষরতার শতকরা হার ১৫.৬৫%। পরুষদের এই হার ২৫.৪২% মহিলাদের হার মাত্র ৫.৮৯%। এই জাতি আধুনিক চিকিৎসা ও চাকুরির সুযোগসুবিধার খুব সামান্য অংশই পেয়েছে। যাই হোক তার পি. ডি. এস. এর দেওয়া সুযোগ সুবিধা উপকৃত হচ্ছে।




Meet Our Team

President

Secretary

Contact Us

Newsletter Sign up

Information

Dakshin Dinajpur Bedia Kalyan Samity a NGO. Work on scheduled tribe culture. Address:- At –Buniadpur, Dist-Dakshin Dinajpur, Stat -West Bengal, India . Regd. No-S/IL/7510

© 2016 Infirmary. All rights reserved | Design by W3layouts